চলচ্চিত্র নির্মানের প্রধান কারিগরী স্তরগুলোর মধ্যে অন্যতম একটা স্তর বা ধাপ, চিত্রনাট্য রচনা। এককথায়ে চিত্রনাট্য হলো কোন চলচ্চিত্র নির্মানের কারিগরি ও শীল্প পরিকল্পনার নক্সা। চিত্রনাট্য রচনা কোন সাহিত্য কর্ম নয় ঠিকই, তবে বর্তমানে তা জনপ্রিয় পাঠ্য হিসাবে সমাদর পাচ্ছে।
এই সরল তিনটে বাক্যের মধ্যেই আমরা চিত্রনাট্য সম্পর্কে একটা কার্যকরি সম্পূর্ণ রূপ দেখতে পাই: চলচ্চিত্র, নির্মানের একাধিক কারিগরী স্তর, শীল্প, সাহিত্য, জনপ্রিয়। এর প্রতিটা শব্দের সাথেই চিত্রনাট্য রচনার ওতপ্রেত সম্পর্ক্য। কোনটার সাথে চিত্রনাট্যের অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক্য কোন কোনটার সাথে তার চোরা যোগাযোগ।
——————
এ জায়গায়ে কিছু কথা বলে রাখা দরকার। বাঙ্গালী স্বভাবগত কবি ফলে কিছুটা অলস। এদের মধ্যে অনেকেই প্রচন্ড মেধাবী। সত্যজ্যিৎ রায়ের আগে পরে আজো অনেক নির্মাতা বা পরিচালক মনে করেন চিত্রনাট্য লিখে বা লিখিয়ে সময় আর পয়সা নষ্ট করবার প্রয়োজন, অন্য কারো থাকলেও তার নেই। অবশ্যই তাদের অনেকেই খুব ভাল চলচ্চিত্রও নির্মান করেছেন। তবে বাঙ্গালীদের মধ্যে সত্যজিৎ রায় প্রথম দেখিয়েছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য চিত্রনাট্য করে, কী ভাবে গুছিয়ে চকচকে ঝকঝকে আন্তর্জাতিকমানের বাংলা চলচ্চিত্র বানানো যায়।
____________
হ্যা, চিত্রনাট্য রচনা মোটেই সাহিত্য সন্মান পায়না; কিন্তু তা অবশ্যই আধুনিকতম শিল্প আর ক্রমোন্নতিশীল বিজ্ঞান। বাংলা ভাষায়ে চলচ্চিত্র-বিজ্ঞানের চর্চা বেশী দিন আগেকার কথা নয়। সর্বোপরি চলচ্চিত্র বিজ্ঞান হাতে কলমে চর্চার বিষয়, এবং তা প্রচন্ড ব্যায় সাপেক্ষ। ফলে চলচ্চিত্র নির্মান চর্চা আর ব্যবসা অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের সর্বত্র।
হলিউড এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আসন দখল করতে পেরেছে তার বিশ্বব্যাপী বাজারের কারনে। ভারতিয় হিন্দী সিনেমাও ঐ একই কারনে অনেক উন্নতি করে ফেলতে পেরেছে।
এখানে ইতিহাস নিয়ে আলাপ করতে বসিনি। তবু প্রেক্ষাপটটা ক্ষাণিক উল্লেখ করে নিলে বোঝা গেল চিত্রনাট্য রচনার ব্যাপারে আলোচনা করতে বসে কেন হলিউডের রচনা শৈলী অনুসরন করবার কথা বলতে চাই! ওখানেই ওরা সবাই চলচ্চিত্র বিজ্ঞানের চর্চা করার সুযোগ পাচ্ছে বিস্তর। পেশা হিসাবেও তাই Screenwriter পেশাটাও পোক্ত হয়ে উঠেছে। আমাদের সেই সুযোগ তেমন ছিলনা।
তবে আশার কথা বর্তমানের টেলি-চিত্র বা টেলিভিশনের জন্য নির্মিত ছোট ছোট নাটক, সিরিয়াল বা সিনেমা নির্মানের প্রয়োজনিয়তা। আমরা যেটাকে বলছি আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন, মানে স্যাটালাইট টেলিভিশনের ব্যাপ্তি, সেটাই বর্তমান চিত্র নির্মাতাদের জন্য চলচ্চিত্র নির্মানের উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
হলিউড বা বম্বের সিনেমার জন্যেও প্রথম প্রথম মঞ্চ নাটকের লোকজনকে ধরে নিয়ে সিনেমার জন্য চিত্রনাট্য লেখানো হতো, ফলে চিত্রনাট্য অনেকটা সংলাপ নির্ভর এবং মঞ্চনাটকের কায়দায়ে লেখবার প্রচলন তৈরী হয়ে গিয়েছিল। মনে রাখতে হবে, মঞ্চে স্থন আর কাল দেখানো যায় না তাই তা সংলাপে বোঝাতে হয়। আর বেতার বা বেডিওতে কিছুই দেখানো সম্ভব নয় তাই সংলাপে তা বোঝাতে আমরা বাধ্য।
ক্রমে, দুই জায়গাতেই সিনেমার জন্য চিত্রনাট্য লেখবার পেশায়ে কিছু ভাল লেখক তৈরি হলো ঠিকই কিন্তু অনেক দিন চিত্রনাট্যের কায়দায়ে তেমন রদবদল হলো না।
আরো ক্ষাণিক পরে, মানে কিছু কাল পরে হলিউডে কাজের প্রসার বাড়লে, চলচ্চিত্র শিল্পের ভিন্ন ভিন্ন পেশায়ে বিভিন্ন দেশের মেধাবী লোকজন একসাথে মিলে মিশে কাজ করতে লাগলো। যে যার কাজে চরম পারদর্শী তবে তাদের শরীরের রং ভিন্ন, মুখের ভাষা ভিন্ন, বুকের সংস্কৃতি, মনের সংস্কার সব ভিন্ন ভিন্ন।  সিনেমা, চলচ্চিত্র নির্মান, পয়সা তাদেরকে একসূত্রে গেথে দিয়েছে।
চিত্রনাট্যের জন্য কর্মপোযোগী, সর্বজনবোধ্য একটা বিজ্ঞান আর রচনা বীধি তৈরি হয়ে গেল ওখানে, পরে ক্রমে ভারতে এবং অন্যন্য দেশের চলচ্চিত্র নির্মান শিল্পী আর কলা কুশলীদের মধ্যে। চলচ্চিত্র নির্মান শিল্প হলো একটা সার্বজনিন মাধ্যম। এর প্রথম কাগজে-কলমে কাজ শুরু চিত্রনাট্য রচনায়ে।
সম্পূর্ণ বিশ্বে তাই বিশ্বের সব কোন থেকেই ভাল চিত্রনাট্য খোঁজা হয়। চিত্রনাট্য রচনার সেই আর্ন্তজাতিক শৈলী নিয়েই এখানে আলোচনা করবো। কারিগরি শৈলীটা রপ্ত করাই প্রথম কথা, ভাষার ব্যবধান, সে দক্ষতা অনেকেরই আছে আমার বিশ্বাস।

Advertisements